ঢাকা, ২১ ডিসেম্বর ২০২৫ – বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অকালে ঝরে গেলেন শরিফ ওসমান বিন হাদি, যিনি সাধারণভাবে ওসমান হাদি নামে পরিচিত। মাত্র ৩২ বছর বয়সে এই তরুণ নেতার মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং দেশের তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আদর্শ এবং নতুন রাজনীতির সম্ভাবনার প্রতি এক নির্মম আঘাত। ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুর পর দেশজুড়ে ব্যাপক প্রতিবাদ, বিক্ষোভ এবং রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা হয়েছে। লাখো মানুষের উপস্থিতিতে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় সংসদ প্রাঙ্গণে, এবং তাকে সমাহিত করা হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সমাধির পাশে।
ওসমান হাদির জীবন ছিল সংগ্রামের। ১৯৯৩ সালের ৩০ জুন ঝালকাঠি জেলার নলছিটিতে একটি ধার্মিক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার বাবা ছিলেন মাদ্রাসা শিক্ষক ও ইমাম। শৈশব থেকেই ন্যায়বিচার, শৃঙ্খলা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার শিক্ষা লাভ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন। কিন্তু তার প্রকৃত উত্থান ঘটে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে। ছাত্র-জনতার এই আন্দোলন শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটায়, এবং ওসমান হাদি এতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। আন্দোলনের পর তিনি ইনকিলাব মঞ্চ নামে একটি যুব-ভিত্তিক রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলেন, যার আহ্বায়ক ও মুখপাত্র হিসেবে তিনি দ্রুত জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত হয়ে ওঠেন।
ইনকিলাব মঞ্চের লক্ষ্য ছিল সমস্ত আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা। ওসমান হাদি তীব্রভাবে সমালোচনা করতেন আওয়ামী লীগের দমননীতি, জুলাই শহীদদের ন্যায়বিচারের অভাব এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদের। তিনি আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধকরণের দাবিতে সোচ্চার ছিলেন এবং জুলাই বিপ্লবের ঘোষণাপত্র প্রকাশের প্রস্তাব করেন। তার বক্তব্য ছিল আপসহীন—প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর সমালোচনা থেকে শুরু করে সেনাবাহিনী এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দুর্বলতার কথা বলতে তিনি কখনো পিছপা হননি। ২০২৫ সালের জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রচারণা শুরু করেন তিনি। তার প্রচারণা ছিল তরুণদের মধ্যে নতুন আশার আলো জ্বালানোর মতো।
কিন্তু এই উত্থানই তার জীবনের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ১২ ডিসেম্বর দুপুরে ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে চলন্ত মোটরসাইকেল থেকে অজ্ঞাত হামলাকারীরা তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি গুরুতর আহত হন। প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুর নেওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তিনি বাঁচেননি।
কেন তাকে গুলি করা হলো? এ প্রশ্ন এখন বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। তদন্তে উঠে এসেছে যে, হামলাকারীরা নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত। প্রধান সন্দেহভাজন ফয়সল করিম মাসুদসহ কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তারা হামলার পর সীমান্ত দিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। অনেকে মনে করেন, ওসমান হাদির তীব্র আওয়ামী লীগ বিরোধিতা এবং নির্বাচনে তার সম্ভাব্য প্রভাবই এ হামলার মূল কারণ। তার সমালোচকরা তাকে র্যাডিক্যাল বললেও, সমর্থকরা দেখেন জুলাই বিপ্লবের আদর্শের রক্ষক হিসেবে। তার মৃত্যুকে অনেকে নির্বাচনী প্রক্রিয়া বানচালের ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছেন। তার তীব্র ভারত-বিরোধী অবস্থানও কিছু মহলে অস্বস্তি তৈরি করেছিল। ফলে তাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য এই হামলা বলে অভিযোগ উঠেছে।
ওসমান হাদির দেশের জন্য অবদান অসীম। তিনি জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তরুণদের রাজনীতিতে সক্রিয় করেছেন। ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে তিনি নতুন প্রজন্মকে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সংগঠিত করেন। জুলাই শহীদদের ন্যায়বিচার, আওয়ামী লীগের দায়মুক্তি না দেওয়া এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষার দাবিতে তার ভূমিকা ছিল অগ্রণী। তিনি তরুণদের মধ্যে নতুন রাজনৈতিক সচেতনতা জাগিয়েছেন, যা প্রচলিত দলগুলোর বাইরে একটি বিকল্প রাজনীতির স্বপ্ন দেখিয়েছে। তার বক্তব্যে ছিল গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র এবং জনগণের ক্ষমতায়নের কথা।
তার মৃত্যুতে দেশজুড়ে শোকের ছায়া। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস তার মৃত্যুকে 'অপূরণীয় ক্ষতি' বলে অভিহিত করেছেন এবং রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করেছেন। তার স্ত্রী ও একমাত্র সন্তানের দায়িত্ব সরকার নেবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার মৃত্যু শুধু শোক নয়, প্রতিবাদের জন্ম দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ হয়েছে, যা কখনো সহিংস রূপ নিয়েছে। এই মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন প্রশ্ন তুলেছে—তরুণ নেতৃত্বের নিরাপত্তা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক স্থানান্তরের চ্যালেঞ্জ নিয়ে।
ওসমান হাদি চলে গেছেন, কিন্তু তার আদর্শ বেঁচে থাকবে তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে। তিনি হয়ে উঠেছেন জুলাই বিপ্লবের এক প্রতীক—যিনি রাজপথ থেকে উঠে এসে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন। তার মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনীতিকে আরও জটিল করে তুলেছে, কিন্তু একই সঙ্গে তরুণদের মধ্যে নতুন সংগ্রামের বীজ বপন করেছে।
